বাংলাদেশের বেসরকারি ও কর্পোরেট খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই খাতেই লাখো তরুণ-তরুণী নিজেদের স্বপ্ন, মেধা ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করছেন। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে এমন এক বাস্তবতা রয়েছে, যা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়—চাকরি হারানোর ভয়ে নীরবে শোষণ সহ্য করার সংস্কৃতি।
আজ দেশের অসংখ্য কর্মী মনে করেন, “চাকরিটা টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় বিষয়।” এই ভয় থেকেই তারা নির্ধারিত অফিস সময়ের পরেও নিয়মিত কাজ করেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অফিসের ফোন ধরেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে ল্যাপটপ খুলে বসেন। অনেকের কাছে এটি আর ব্যতিক্রম নয়, বরং চাকরির অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের পাশাপাশি “কত রাত পর্যন্ত অফিসে থাকা যায়” সেটিও যেন এক ধরনের অদৃশ্য মানদণ্ড। সময়মতো অফিস ছেড়ে যাওয়া কর্মীকে অনেক সময় কম নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ একজন কর্মীর দক্ষতা তার অফিসে কাটানো ঘণ্টা দিয়ে নয়, কাজের মান ও ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
এই দীর্ঘমেয়াদি কর্মচাপের প্রভাব শুধু একজন কর্মীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সন্তান এবং পুরো সমাজে। দিনের পর দিন অতিরিক্ত মানসিক চাপ উদ্বেগ, অনিদ্রা, বিষণ্নতা, বার্নআউট এবং হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। কর্মী যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন, তখন সন্তান তার বাবা বা মাকে পান না আগের মতো; দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়, পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য যে চাকরি, সেটিই কখনো কখনো মানসিক অশান্তির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে নারী কর্মীরা দ্বৈত চাপের মুখোমুখি হন। অফিস শেষে তাদের অনেকেরই সংসার, সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে দীর্ঘ অফিস সময় তাদের ওপর আরও বড় শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এ কারণেই কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা, নির্ধারিত সময়ে ছুটি এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু মানবিক নয়, একটি পেশাগত দায়িত্বও।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—একজন কর্মী কি তার কর্মঘণ্টার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের অধিকার হারিয়ে ফেলেন? একজন মানুষ কি শুধুই একজন কর্মচারী, নাকি তিনি একই সঙ্গে একজন বাবা, মা, স্বামী, স্ত্রী কিংবা সন্তানের অভিভাবক? কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সুস্থ সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।
এ কথা ঠিক, সব প্রতিষ্ঠান একই রকম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের কল্যাণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কাজ-জীবনের ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত সময় কাজ করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু ব্যতিক্রম যদি নিয়মে পরিণত হয়, তখন সেটি আর পেশাদার সংস্কৃতি নয়; বরং একটি অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের লক্ষণ।
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ এবং মানবসম্পদ বিভাগ—সবারই দায়িত্ব কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম ও কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবে কার্যকর করা। একই সঙ্গে কর্মীদেরও এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে তারা যৌক্তিক দাবি তুললে চাকরি হারানোর ভয় বা পদোন্নতি আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগবেন না।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, বড় মুনাফা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো—যারা সেই উন্নয়নের জন্য প্রতিদিন শ্রম দিচ্ছেন, তারা কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবন পাচ্ছেন।
আমরা এমন একটি কর্মসংস্কৃতি চাই, যেখানে নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু শোষণ থাকবে না; দায়িত্ব থাকবে, কিন্তু অযৌক্তিক চাপ থাকবে না; সাফল্যের লক্ষ্য থাকবে, কিন্তু তার জন্য মানুষের পরিবার, স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তিকে বিসর্জন দিতে হবে না। কারণ একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ শুধু কর্মীর অধিকার নয়, টেকসই অর্থনীতি ও মানবিক সমাজ গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।
কলাম লেখক
মেজবা রহমান, গণমাধ্যমকর্মী
