আজকের দিনে বিনোদন অঙ্গনের দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে। কে আসল মডেল, কে প্রকৃত অভিনেত্রী, আর কে সস্তা নামধারী শিল্পী তা চেনা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যারা দীর্ঘকাল মিডিয়ার সাথে যুক্ত, তাদের জন্যই যদি এই পার্থক্য করা কঠিন হয়, তবে সাধারণ মানুষের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। শিল্পের নামে আজ যা চলছে, তা কি আদৌ শিল্প? একটু খেয়াল করলে দেখবেন, আজকাল অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানের নামে নগ্ন হওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
পর্দার নায়িকা আর শাড়ি বা দেহ ব্যবসায়ীর পার্থক্য আজ ঘুচে যাওয়ার পথে। প্রশ্ন জাগে, রুচির এই দুর্ভিক্ষ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? বর্তমানে একদল সস্তা অনলাইন পোর্টাল জন্মেছে, যাদের একমাত্র লক্ষ্য ভিউ। এই ভিউর নেশায় তারা অশালীনতা বা অর্ধ-উলঙ্গতাকে শিল্পের তকমা দিয়ে ব্যাপক প্রচার করে। আরও ভয়াবহ ও দুঃখজনক বিষয় হলো, কিছুদিন যেতে না যেতেই এই বিতর্কিত ব্যক্তিদেরই আমাদের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেন অশ্লীলতাই এখন জনপ্রিয়তার মাপকাঠি!
এই অপসংস্কৃতির দায় আসলে কার? কেন এই নোংরা সংস্কৃতির নীলনকশা বন্ধ করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই? দুঃখজনক হলেও সত্যি, সরকারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যেন কোনো দৃষ্টিপাত নেই। কিন্তু কেন এই উদাসীনতা? আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে যাদের পরিচিত হওয়ার কথা ছিল, তারা আজ কোন অতলে হারিয়ে গেছেন?
বর্তমান এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে আমরা এক বিকৃত বাংলাদেশ দেখব। এমন এক দিন আসবে যখন পর্নো তারকারা মূলধারার টিভিতে বীরদর্পে সাক্ষাৎকার দেবেন। বিভিন্ন করপোরেট শোরুম উদ্বোধন থেকে শুরু করে ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আদর্শ বলে কিছু থাকবে না। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির দায়িত্ব আজ কে নেবেন? আমরা যদি আজ গভীর চিন্তা না করি, তবে আমাদের সন্তানরা এক পরিচয়হীন ও কুরুচিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।
আমাদের নিজস্ব শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। আজ যদি আমরা এই পতনের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে বৃদ্ধ বয়সে নিজেদের কাছেই নিজেরা অপরাধী হয়ে থাকব। হয়তো আমরা সবাই মিলে এই জোয়ার প্রতিরোধ করতে পারব না, কিন্তু অন্তত প্রতিবাদ বা তীব্র নিন্দা জানানো তো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই পতনকে উচ্চকণ্ঠে ‘ধিক্কার’ জানানোর সময় এখনই।
মনে রাখবেন, এটি কেবল আমার একার দায়িত্ব নয়; এটি আমার, আপনার এবং আমাদের সবার দায়বদ্ধতা। প্রতিবাদ করুন আপনার বক্তব্যে, আপনার শাণিত কলমে, ফেসবুকের দেওয়ালে কিংবা চায়ের আড্ডায়।
প্রতিবাদ আমাদের করতেই হবে। কারণ আমরা বাঙালি এবং আমরা লাল-সবুজের বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের হাজার বছরের একটি নিজস্ব গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি আছে। সেই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাটাও আজ একটি বড় যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের সৈনিক আমি, আপনি, আমরা সবাই। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার আর কোনো সুযোগ নেই। এখনই সময় সোচ্চার হওয়ার।
লেখক: – রানা বর্তমান, নাট্য নির্মাতা
