গল্পের সততাই কালজয়ী, ট্রেন্ডের জোয়ার সাময়িক

গল্পের সততাই কালজয়ী, ট্রেন্ডের জোয়ার সাময়িক

বর্তমান সময়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার শফিক রিয়ান। উপন্যাসের জটিল মনস্তত্ত্ব কিংবা কবিতার গভীর আবেগ—দুই মাধ্যমেই যিনি পাঠকের হৃদয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। ‘আজ রাতে চাঁদ উঠবে না’ কিংবা ‘ছায়াবৃত্ত’র মতো সাড়াজাগানো উপন্যাসের মধ্য দিয়ে পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করা এই লেখক কেবল বইয়ের পাতাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও জীবনবোধের গল্পগুলোকে এখন বুনে দিচ্ছেন পর্দার আলো-ছায়ায়। ভিউ বা ক্ষণস্থায়ী ট্রেন্ডের জোয়ারে না ভেসে গল্পের সততা ও স্বকীয়তা ধরে রাখাই তাঁর লেখার মূল দর্শন। সাহিত্য প্রকাশের পাশাপাশি সম্প্রতি বিনোদন জগতেও চিত্রনাট্যকার হিসেবে শুভসূচনা করেছেন তিনি। সাহিত্যের নিরব শব্দগুলোকে কীভাবে তিনি দৃশ্যের ক্যানভাসে রূপ দিচ্ছেন, নতুন উপন্যাস ও ওটিটি ভাবনাসহ সাহিত্য-সংস্কৃতির নানান দিক নিয়ে শফিক রিয়ান কথা বলেছেন বর্তমান আলোর সঙ্গে

বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে যাচ্ছে?
নতুন কোন গল্পের ভাবনাতেই সময় কাটছে মূলত। একটি পূর্ণাঙ্গ নাটকের চিত্রনাট্যের কাজ চলছে, যেখানে জীবনের নানা দ্বন্দ্ব আর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ফুটে উঠবে। পাশাপাশি কিছু ছোটগল্পের খসড়া আর নতুন এক দীর্ঘ ভাবনার পেছনে সময় দিচ্ছি। বলা যায়, ভাবনাগুলোকে কাগজের পাতায় আর দৃশ্যের ক্যানভাসে রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়েই কাটছে দিন।

সাহিত্যের পাশাপাশি বিনোদন জগতেও নাম লিখিয়েছেন আপনি। চলতি বছরে আপনার গল্পে দুটি নাটক ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। দর্শকদের সাড়া কেমন পেয়েছেন?
সাহিত্যের পাতার নিরব শব্দগুলো যখন পর্দার আলো-ছায়ায় রূপ নেয়, সেটির অনুভূতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। চলতি বছরের দুটি নাটক থেকেই দর্শকদের দারুণ ভালোবাসা ও ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। পাঠক যেমন পড়ে নিজের কল্পনায় চরিত্র আঁকেন, দর্শকরা ঠিক তেমনিভাবে পর্দায় চরিত্রগুলোকে লালন করেন। তাদের প্রতিক্রিয়া, সূক্ষ্ম অনুভূতি আর ভালোবাসা আমাকে নতুন করে শক্তি দিয়েছে।

আগামীতে আর কোনো নাটক আসবে আপনার লেখায়?
হ্যাঁ, অবশ্যই। লেখালেখি তো আমার কাছে একটি নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা। নতুন একটি নাটকের চিত্রনাট্যের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করছি, সেটাও দর্শক খুব দ্রুত দেখতে পাবে। এছাড়া আরও দু-একটি গল্প নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। ব্যাটে-বলে মিললে দর্শকরা শিগগিরই নতুন গল্প দেখতে পাবেন।

বছর তো প্রায় শেষের দিকে, নতুন উপন্যাস কবে পাবে পাঠকগণ?
উপন্যাস আমার জন্য এক গভীর অনুভূতি ও সাধনার জায়গা। একটি দীর্ঘ উপন্যাস তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং এতে গভীর মনোযোগের প্রয়োজন হয়। খুব শীগ্রই নতুন বই প্রকাশ নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক সুখবর বা ঘোষণা নিয়ে আসছি। কাজ গুটিয়ে আনছি, যাতে পাঠকদের হাতে একটি সার্থক সৃষ্টি তুলে দেওয়া যায়।

একক নাটকে আপনার গল্প আমরা দেখেছি, আগামীতে ধারাবাহিক নাটক বা ওটিটিতে গল্প লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে?
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপ্তি আর স্বাধীনতা লেখকদের জন্য নতুন এক দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সেখানে চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার চমৎকার সুযোগ থাকে। ওটিটির জন্য তুলনামূলক একটু জটিল এবং দীর্ঘতর প্লট নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা অবশ্যই আছে। গল্প যদি সেই কোয়ালিটি দাবি করে, তবে ওটিটি বা ধারাবাহিকের দিকে নিশ্চয়ই পা বাড়াব।

যদিও নাটকে আপনার যাত্রা মাত্র শুরু, এখন পর্যন্ত ট্রেন্ডিং গল্প কিংবা ভিউ ভিত্তিক গল্প লেখার প্রস্তাব এসেছে বা কোনো চাপ?
প্রস্তাব বা প্রত্যাশা তো থাকেই। বর্তমান মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি তো অনেকটাই বাজারের সমীকরণের উপর নির্ভর করে চলে। তবে আমি বিশ্বাস করি, ট্রেন্ড সাময়িক হলেও একটি সৎ ও শক্ত ভিত্তি সম্পন্ন গল্প কালজয়ী হতে পারে। আমার চেষ্টা থাকে ভিউ বা ট্রেন্ডের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে নিজের লেখার স্বকীয়তা ও সততা বজায় রাখার। শুভাকাঙ্ক্ষী ও নির্মাতারাও আমার এই ভাবনার মূল্যায়ন করেন।

এমন কোনো শক্তিশালী গল্প বলার ইচ্ছা বা স্বপ্ন আছে যা সমাজের কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসবে?
একজন লেখক বা শিল্পীর মূল দায়বদ্ধতা সমাজের প্রতিই। আমি এমন একটি গল্প বলে যেতে চাই, যা মানুষকে শুধু বিনোদনই দেবে না, বরং তাদের মনের ভেতরে থাকা অপ্রকাশিত কথাগুলোকে উসকে দেবে, চিন্তার খোরাক জোগাবে। আমাদের সমাজ ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক যেসব দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেগুলোকে সাহসের সাথে পর্দায় ও পাতায় তুলে আনতে চাই। আমার লেখা যদি একজন মানুষের ভেতরেও ইতিবাচক নাড়া দেয়, তবেই একজন গল্পকার হিসেবে আমার যাত্রা সার্থক হবে।